এখন আমরা বোধিসত্ত্বের একটি দান কাহিনি পড়ব। অনেক অনেক দিন আগে ভরত নামে একজন রাজা রাজত্ব করতেন। তিনি যথাযথভাবে রাজধর্ম পালন করতেন। প্রজাদের সন্তানস্নেহে প্রতিপালন করতেন। দরিদ্র, পথিক, ভিখারি ও যাচকদের মহাদানে সন্তুষ্ট করতেন। সমুদ্র বিজয়া নামে তাঁর এক পণ্ডিত ও জ্ঞানী রানি ছিলেন। একদিন রাজা তাঁর দানশালা পরিদর্শনের সময় ভাবলেন, 'আমি যে দান করি, তা অনেক সময় দুঃশীল ও লোভী লোকেরা ভোগ করে থাকে। এতে আমার তৃপ্তি হয় না। আমি শীলবান, উত্তম দানের পাত্র প্রত্যেকবুদ্ধগণকে দান করতে চাই। কিন্তু তাঁরা তো হিমবন্ত প্রদেশে থাকেন। কীভাবে তাদের নিমন্ত্রণ করি?' তিনি বিষয়টি রানির সঙ্গে আলোচনা করলেন। রানি বললেন, 'মহারাজ, কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা দান, শীল ও সত্য বলে পুষ্প পাঠিয়ে প্রত্যেকবুদ্ধগণকে নিমন্ত্রণ করব এবং তাঁরা আগমন করলে অষ্টপরিষ্কার যুক্ত দান দেব।' রাজা প্রস্তাবটি অনুমোদন করলেন এবং সমস্ত নগরবাসীকে শীল পালনের নির্দেশ দিলেন। তিনিও পরিবার পরিজনসহ শীল পালন এবং মহাদান করতে থাকলেন। সোনার পাত্রে ফুল নিয়ে তিনি প্রাসাদ প্রাঙ্গণে নেমে এলেন। এরপর ভূমিতে পূর্বমুখী হয়ে পঞ্চাঙ্গে প্রণাম করে পূর্ব দিকে যে সকল অর্হৎ আছেন সকলকে প্রণাম করলেন। পূর্বদিকে কোনো প্রত্যেকবুদ্ধ থাকলে তাঁদেরকে ভিক্ষা গ্রহণের অনুরোধ করলেন। এরপর সাতমুষ্টি ফুল নিক্ষেপ করলেন। পূর্বদিকে কোনো প্রত্যেকবুদ্ধ ছিলেন না বলে পরদিন কেউ এলেন না ।
এভাবে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনেও তিনি দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকের প্রত্যেকবুদ্ধদের প্রতি পুষ্প নিক্ষেপ করলেন।
নমস্কার করে প্রত্যেকবুদ্ধগণকে আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। চতুর্থ দিনে উত্তর দিকে একইভাবে আমন্ত্রণ জানালেন। উত্তর-হিমালয়ে বসবাসকারী প্রত্যেকবুদ্ধগণের গুহায় রাজা প্রেরিত পুষ্প পৌঁছে গেল। তাঁদের শরীরে সেই ফুলগুলো পতিত হলো। তাঁরা চিন্তা করে জানতে পারলেন রাজা ভরত তাঁদের নিমন্ত্রণ করছেন। তখন তাঁরা সাতজন প্রত্যেকবুদ্ধকে রাজার নিমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য প্রেরণ করলেন। এই সাতজন প্রত্যেকবুদ্ধ আকাশপথে রাজদ্বারে এসে পৌঁছালেন। রাজা প্রত্যেকবুদ্ধগণকে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। অতি সমাদরে তাঁদের রাজগৃহে নিয়ে গেলেন। অনেক আপ্যায়ন করালেন। অনেক দান করলেন। পরদিনের জন্য আবারও নিমন্ত্রণ করলেন। এভাবে ছয় দিন পর্যন্ত এঁদের ভোজন ও মহাদান পর্ব শেষে সপ্তম দিনে অষ্টপরিষ্কার দানের আয়োজন করলেন। অনন্তর প্রত্যেকবুদ্ধগণের মধ্যে যিনি প্রধান স্থবির, তিনি দান অনুমোদন করে এরূপ উপদেশ প্রদান করলেন, 'দানফলই কেবল আমাদের কাজে আসে। গৃহ, অর্থ সম্পদ,
দেহ, বল সবই ক্ষয়যোগ্য। 'অতঃপর 'অপ্রমত্ত' হতে উপদেশ দিয়ে তিনি চলে গেলেন।
অবশিষ্ট ভিক্ষুরাও নিম্নোক্ত উপদেশ প্রদান করে চলে গেলেন:
'যিনি ধার্মিক এবং শীলবান তাঁর দানফল মরণের পরও তাঁকে অনুসরণ করে। অল্প দানেও মহাফল হয়, যদি তা শ্রদ্ধাযুক্ত হয়। উর্বর ভূমিতে চারা রোপণ করলে যেমন উত্তম ফসল পাওয়া যায়, সেরূপ শীলবান ও উত্তম ব্যক্তিকে দান করলে মহাফল অর্জিত হয়। দান প্রশংসনীয় কাজ। দান ও প্রজ্ঞাবলে নির্বাণ লাভ সম্ভব।'
অতঃপর, রাজা ও রানি আজীবন দানব্রতে রত থেকে স্বর্গ লাভ করেন। ঐ রাজা ভরত ছিলেন বোধিসত্ত্ব এবং রানি সমুদ্র বিজয়া ছিলেন গোপাদেবী। এই কাহিনী শেষে গৌতম বুদ্ধ বলেন, 'জ্ঞানীরা প্রাচীনকালেও বিবেচনা করে দান করতেন।'
Read more